চট্টগ্রাম রবিবার , ৩০ নভেম্বর ২০২৫
  1. সর্বশেষ

বিদেশে কর্মী প্রেরণের পদ্ধতি বদলাতে হবে

প্রতিবেদক
admin
৩০ নভেম্বর ২০২৫, ১২:৫১ অপরাহ্ণ

Link Copied!

এ কে এম আতিকুর রহমান ::

গণমাধ্যমে প্রকাশিত তথ্য মতে, গত ১১ নভেম্বর দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক) এক সংবাদ সম্মেলনে জানায় যে মালয়েশিয়ায় কর্মী পাঠানোর নামে ‘সিন্ডিকেট করে অর্থ আত্মসাৎ ও পাচারের’ অভিযোগে চারটি রিক্রুটিং এজেন্সির বিরুদ্ধে মামলা করার সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে। এসব এজেন্সি ১৮ হাজার ৫৬৩ জন কর্মীর কাছ থেকে সরকার নির্ধারিত ৭৮ হাজার ৯৯০ টাকার পরিবর্তে ‘পাঁচ গুণ বেশি অর্থ’ আদায় করেছে। তাই চার মামলায় ৩১০ কোটি ৯৩ লাখ ৯৫ হাজার টাকা ‘আত্মসাৎ ও পাচারের’ অভিযোগ আনা হচ্ছে। মালয়েশিয়াগামী কর্মীদের কাছ থেকে অতিরিক্ত অর্থ আদায়ের জন্য এ বছরের মার্চ মাসে ১২টি, সেপ্টেম্বর মাসে ১৩টি রিক্রুটিং এজেন্সির নামে এবং নভেম্বর মাসে ১১ জনের নামে মামলা করেছে দুদক।

 

এসব মামলা নতুন কিছু নয়, আগেও হয়েছে, ভবিষ্যতেও হবে। তবে ভুক্তভোগী কর্মীরা তাঁদের দেওয়া অতিরিক্ত অর্থ এজেন্সির কাছ থেকে ফেরত পাবেন কি না, তা নিয়ে সন্দেহ থেকেই যায়।

 

 

অভিবাসী কর্মীদের রিক্রুটিং এজেন্সির এই শোষণ শুধু যে মালয়েশিয়ার ক্ষেত্রেই ঘটছে, তেমনটি নয়। এজেন্সিগুলো বাংলাদেশ থেকে বিশ্বের যেকোনো প্রান্তেই কর্মী প্রেরণ করুক না কেন, প্রত্যেক কর্মীর কাছ থেকেই অতিরিক্ত অর্থ আদায় নিয়মিত ব্যাপার।

 

ওই অর্থের কোনো বৈধ কাগজপত্রও কর্মীদের দেওয়া হয় না। এ ছাড়া রিক্রুটিং এজেন্সিগুলো সংগত কারণেই ওই অর্থ দেশের কোনো ব্যাংকেও জমা রাখে না। বহু বছর থেকেই এমনটি চলে আসছে। বলার অপেক্ষা রাখে না যে এসব রিক্রুটিং এজেন্সির মালিকরা সরকার ও প্রশাসনের ঘনিষ্ঠ হওয়ায় তাঁদের এই কর্মী শোষণ কার্যক্রম ‘ম্যানেজড’ হয়ে যায়।

 

কর্মীরাই চিরদিন শোষণের শিকার হয়ে থাকেন। আর মালয়েশিয়ার ক্ষেত্রে আমাদের এজেন্সিগুলোর, বিশেষ করে নেতৃত্বদানকারী সিন্ডিকেটের এতটাই ক্ষমতা যে দুই প্রান্তেই তাদের স্বার্থ রক্ষার সুব্যবস্থা থাকে।

 

২০২১ সালের ১৯ ডিসেম্বর বাংলাদেশ ও মালয়েশিয়ার মধ্যে স্বাক্ষরিত সমঝোতা স্মারকের উল্লেখ করে খবরে বলা হয়েছে, ওই সময় ২৫ থেকে বাড়িয়ে ১০০ রিক্রুটিং এজেন্সিকে কর্মী প্রেরণের সুযোগ দিলেও সেটি একটি সিন্ডিকেটের নিয়ন্ত্রণেই ছিল। তা ছাড়া সরকারের নির্ধারিত অভিবাসন ব্যয় ৭৮ হাজার ৫৪০ টাকা হলেও একেকজনের গড়ে পাঁচ লাখ টাকা ব্যয় হয়েছে। এর আগে ২০১৬ সালে দুই দেশের মধ্যে স্বাক্ষরিত ‘জিটুজি প্লাস’ পদ্ধতির কথা বলতে গিয়ে ১০টি নির্ধারিত এজেন্সির সিন্ডিকেটের উল্লেখ করা হয়েছে।

 

 

সত্যি বলতে, ওই পদ্ধতির অনুসরণে একজন কর্মীও ‘জিটুজি’ অনুসরণে যেতে পারেননি, সব কর্মীই গেছেন ‘প্লাস’-এর অনুসরণে। পদ্ধতিটির নামের সঙ্গে ‘জিটুজি’ শব্দটি রাখা হয়েছিল জনগণকে ধোঁকা দেওয়ার জন্য। সম্পূর্ণ নিয়োগপ্রক্রিয়াটির নিয়ন্ত্রণে ছিল ‘প্লাস সিন্ডিকেট’-এর ১০টি বাংলাদেশি রিক্রুটিং এজেন্সি, যারা ছিল উভয় দেশের নেতৃত্বের আশীর্বাদপুষ্ট। এভাবে দুই বছর সময়ের মধ্যেই তারা বাংলাদেশের দরিদ্র অভিবাসী কর্মীদের কাছ থেকে হাতিয়ে নিয়েছে বিপুল পরিমাণ অর্থ, যার বেশির ভাগই বাংলাদেশ থেকে অবৈধ পথে বের হয়ে গেছে।

 

বাংলাদেশ থেকে মালয়েশিয়ায় কর্মী যাওয়ার সংখ্যা শুরুতে কম হলেও কর্মীরা অনেকটা নিশ্চিন্তেই সেখানে যেতেন। অনেক সময় কর্মীদের বিমানভাড়াও নিয়োগকর্তারা বহন করতেন। কর্মী যাওয়ার সংখ্যা বাড়তে থাকলে তাঁরা স্বার্থান্বেষীদের লোলুপ দৃষ্টির শিকার হন, তাঁদের নানাভাবে শোষণ এবং প্রতারণা শুরু হয়। উদ্ভূত পরিস্থিতিতে ১৯৯৬ সালের জুলাই মাসে মালয়েশিয়া সরকার বাংলাদেশি কর্মীদের নিয়োগে নিষেধাজ্ঞা আরোপ করে। অভ্যন্তরীণ চাহিদার পরিপ্রেক্ষিতে মালয়েশিয়া ২০০০ সালে বিশেষ অনুমোদনের মাধ্যমে বাংলাদেশ থেকে কর্মী নিয়োগের অনুমতি দেয়। কর্মীদের নানাভাবে হেনস্তার পরিপ্রেক্ষিতে বছর না ঘুরতেই মালয়েশিয়া ২০০১ সালের জানুয়ারিতে আমাদের কর্মী নেওয়া বন্ধ করে দেয়। ২০০৩ সালের জুলাই মাসে মালয়েশিয়া আরোপিত নিষেধাজ্ঞা তুলে নেয় এবং বাংলাদেশ থেকে কর্মী নেওয়ার জন্য ওই বছরের অক্টোবরে ঢাকায় একটি সমঝোতা স্মারক স্বাক্ষরিত হয়। ২০০৭-০৮ সালে তত্ত্বাবধায়ক সরকারের আমলে রিক্রুটিং এজেন্সিগুলোর অনৈতিক প্রতিযোগিতায় সৃষ্ট পরিস্থিতিতে মালয়েশিয়া ২০০৯ সালের মার্চ মাসে আমাদের কর্মী নেওয়া স্থগিত করে। এরপর নিষেধাজ্ঞা তুলে ২০১২ সালের নভেম্বর মাসে দুই দেশের মধ্যে স্বাক্ষরিত ‘জিটুজি’ পদ্ধতিতে কর্মী নিয়োগ সংক্রান্ত একটি সমঝোতা স্মারক স্বাক্ষরিত হয়। এরই ভিত্তিতে ২০১৩ সালের এপ্রিল মাস থেকে কর্মীরা মালয়েশিয়ায় যাওয়া শুরু করেন।

 

মালয়েশিয়ায় বাংলাদেশি কর্মী প্রেরণের এক ব্যতিক্রমী ইতিহাস ছিল ২০১২ সালে স্বাক্ষরিত ‘জিটুজি’ পদ্ধতির সমঝোতা স্মারকটি। ওই পদ্ধতিতে একজন কর্মীর অভিবাসন ব্যয় ছিল ৩৫ হাজার টাকারও কম। তবে ওই পদ্ধতিটিকে ২০১৬ সালে ১০টি রিক্রুটিং এজেন্সির একটি সুবিধাবাদী কর্মী শোষক সিন্ডিকেট ‘জিটুজি প্লাস’ সমঝোতা স্মারকের মাধ্যমে গলা টিপে হত্যা করে। মালয়েশিয়ায় সরকার পরিবর্তন হলে ২০১৮ সালের মে মাসে ওই সিন্ডিকেটের শোষণ কার্যক্রম বন্ধ হয়ে যায়। এরপর ২০২১ সালের ১৯ ডিসেম্বর দুই দেশের মধ্যে নতুন সমঝোতা স্মারক স্বাক্ষরের মাধ্যমে প্রথমে ২৫টি হলেও পড়ে ১০০টি এজেন্সির সিন্ডিকেটের মধ্যেই মালয়েশিয়ায় কর্মী পাঠানোর কাজটি চলতে থাকে। কিন্তু ২০২৪ সালের মে মাসের পর মালয়েশিয়ায় কর্মী যাওয়া বন্ধ হয়ে যায়।

 

 

বাংলাদেশ ও মালয়েশিয়া উভয় পক্ষের এজেন্সিগুলোর স্বার্থেই এই শ্রমবাজারটি আবার খুলবে এবং সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের শোষণকর্ম শেষ হলে আবার বন্ধ হবে। আর দুদকের মামলা-মোকদ্দমার বোঝাও বেড়ে চলবে। মাঝ থেকে নিরুপায় বিদেশগামী কর্মীরা শোষণের জাঁতাকলে পিষ্ট হতেই থাকবেন। এ যে হাজার হাজার কোটি টাকার খেলা। এ খেলা থামাতে হলে একদিকে যেমন শোষণহীন কর্মীবান্ধব নিয়োগপদ্ধতির প্রতিষ্ঠা করতে হবে, তেমনি তা বাস্তবায়নে দৃঢ়প্রতিজ্ঞ এবং দেশপ্রেমিক নেতৃত্বের প্রয়োজন হবে।

 

আমরা জানি, ২০১২ সালের ২৬ নভেম্বর বাংলাদেশ ও মালয়েশিয়ার মধ্যে বাংলাদেশ থেকে ‘জিটুজি’ পদ্ধতিতে কর্মী নিয়োগ সংক্রান্ত একটি সমঝোতা স্মারক স্বাক্ষরিত হয়েছিল, যা বিশ্ববাসীর, বিশেষ করে অভিবাসনের সঙ্গে যুক্ত সব সংস্থার প্রশংসা অর্জন করেছিল। যদিও মালয়েশিয়াগামী বাংলাদেশি কর্মীদের জন্য ওই প্রক্রিয়াটি সম্পূর্ণ নিরাপদ এবং অভিবাসনবান্ধব ছিল, কিন্তু স্বার্থান্বেষী মহলের উদ্দেশ্য পূরণ করছিল না বিধায় মাত্র ১০ হাজার কর্মী মালয়েশিয়ায় যাওয়ার পর প্রক্রিয়াটির অপমৃত্যু ঘটানো হয়। আমরা ওই পদ্ধতিটি ব্যবহার করে কর্মী পাঠাতে পারি। তবে আগের মতো যাতে না ঘটে সে জন্য রিক্রুটিং এজেন্সিগুলোকে এই পদ্ধতিতে সংযুক্ত করতে হবে। এজেন্সিগুলোর কাজ হবে মার্কেটিং অর্থাৎ নিয়োগকারীদের কাছ থেকে কর্মী চাহিদা সংগ্রহ করে আমাদের সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয়ে জমা দেওয়া এবং অনুমোদন নেওয়া। মন্ত্রণালয় আমাদের দূতাবাস থেকে ওই সব চাহিদাপত্রের সত্যতা যাচাই করে আনার পর চাহিদা মোতাবেক বিদেশ যেতে ইচ্ছুক কর্মীদের ডেটা ব্যাংক থেকে কর্মী প্রেরণ করবে। কর্মীরা কর্মস্থলে যোগদান করার পরপরই রিক্রুটিং এজেন্সিগুলো সরকারের নির্দিষ্ট করা হারে ফি পাবে। কর্মীদের সঙ্গে এজেন্সিগুলোর যোগাযোগ থাকায় যে অতিরিক্ত অর্থ নেওয়া হয় এই প্রক্রিয়ায়, সেটি কখনো সম্ভব হবে না, যদিও এজেন্সিগুলোর স্বার্থও সংরক্ষিত থাকবে। তবে যে প্রশ্নটি থেকেই যায়, তা হলো কর্মীদের পকেট থেকে অর্থ লুটপাটের এবং বিদেশে অর্থপাচারের বিদ্যমান সুযোগটা কি এজেন্সিগুলো এত সহজে হাতছাড়া করতে সম্মত হবে? এই দরিদ্র কর্মীদের প্রতি তাদের মানবিকতা কি কখনো জাগ্রত হবে না? আমাদের বিশ্বাস, সরকার যদি যথাযথ পদক্ষেপ গ্রহণ করে, তাহলে এই পদ্ধতির বাস্তবায়ন কঠিন কিছু নয়।

 

লেখক : সাবেক রাষ্ট্রদূত ও সচিব

আরও পড়ুন

চট্টগ্রাম-কক্সবাজার মহাসড়ক ৬ লেনের দাবিতে অবরোধ

বিদ্যুৎস্পৃষ্টে আহত ইগল হাসপাতালে

ভারতের অনুমতি না মেলায় বুড়িমারীতে আটকা ভুটানের পণ্য

খালেদা জিয়ার শারীরিক অবস্থা একই রকম, বিদেশে নেওয়ার প্রস্তুতি থাকলেও অনিশ্চয়তা

খাতুনগঞ্জে কমেছে চিনির দাম 

এলো অ্যাপল-অ্যান্ড্রয়েডে ফাইল শেয়ারের সুবিধা

পেঁয়াজ কাটলে চোখে পানি আসে কেন

কারাগারে অসুস্থ হলমার্ক গ্রুপের এমডি তানভীরের ঢামেকে মৃত্যু

রুদ্ধশ্বাস ম্যাচে শেষ ওভারে জয়, সিরিজে সমতা বাংলাদেশের

তারেক রহমানের দেশে ফেরার বিষয়ে সরকারের কোনো বিধিনিষেধ নেই: প্রেস সচিব

এরশাদ উল্লাহর গণসংযোগে মোহাম্মদ ইসমাইলের সক্রিয় ভূমিকা প্রশংসিত

বিনিয়োগ-উৎপাদনই টেকসই পথ, ঋণ নির্ভরতা নয়: আমির খসরু